কমলগঞ্জে অর্ধকোটি টাকার গরু চুরি সাড়ে ৩ মাসে

প্রকাশিত: ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০১৯

কমলগঞ্জে অর্ধকোটি টাকার গরু চুরি সাড়ে ৩ মাসে

সোনালী সিলেট ডেস্ক ::: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান ও গ্রামের কৃষকের গোয়াল ঘর কিংবা পাহাড় থেকে গরু চুরির হিড়িক পড়েছে। দুই-চারদিন পরপর উপজেলার কোথাও না কোথাও গরু চুরি ঘটনায় আতংকে রয়েছেন কৃষক ও চা শ্রমিকরা।

কমলগঞ্জ উপজেলার কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়ন, মাধবপুর, পতনঊষার, আলীনগর, শমসেরনগর, রহিমপুর ও আদমপুর ইউনিয়নে এই চুরির প্রবণতা বেশি।

বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) দিন দুপুরেই উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের মাধবপুর চা বাগানের টিল্লা বাংলো ও নুরজাহান চা বাগান এলাকা থেকে ৪টি গরু চুরি হয়।

একটি প্রাইভেটকারে বহন করার সময় ২টি গরুসহ ৩ চোরকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ডলুবাড়ী এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে আটক করা হয়। পরে গণধোলাই দিয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে স্থানীয় জনতা।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী অনিমেষ সিংহ জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে নুরজাহান চা বাগানের বিমল সাঁওতাল এর দুটি গরু একটি প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখে ফেলে নুরজাহান চা বাগান এলাকার ময়নামতি কানু। তার সন্দেহ হলে সে ডলুবাড়ী এলাকায় তার পরিচিত লোকদের মোবাইল ফোনে ঘটনাটি জানায়। এই খবরে এলাকার লোকজন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে সন্ধ্যায় প্রাইভেটকারটি গতিরোধ করে এবং গাড়ীর মধ্যে থাকা দুটি গরুসহ তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে নুরজাহান চা বাগান এলাকা থেকে গরু চুরির কথা স্বীকার করে।

পরে তাদের উত্তম-মধ্যম দিয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন স্থানীয়রা।

আটককৃতরা হলেন- শ্রীমঙ্গল উপজেলার মোতাব্বির হোসেন (২৫), আব্দুল আহাদ (৩০), জাকির হোসেন (২৮)। এ সময় তাদের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়।

এদিকে কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মহিলা ইউপি সদস্য কবিতা কর্মকার জানান, তার ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ১টি গরু সাড়ে তিন মাস পূর্বে চোর দল নিয়ে সেকশন থেকে নিয়ে যায়। এরপর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফুলবাড়ি চা বাগানের সেকশন ও শ্রমিকের বসতবাড়ি থেকে লাল মিয়ার প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু, আতর আলী মেম্বারের প্রায় ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ১টি গরু, জয়নাল মিয়ার প্রায় ৩ লক্ষ টাকা মূল্যের ৫টি গরু, সামছু মিয়ার প্রায় ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ১ টি গরু, চন্দন বাউরীর প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি গরু, মিলন সাঁওতালের প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ১টি গরুসহ সাড়ে ৩ মাসে বাগানের সেকশন ও বসতবাড়ি থেকে প্রায় ৮০টি গরু চুরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে ফুলবাড়ি চা বাগান এলাকা থেকেই প্রায় অর্ধকোটি টাকার গরু চুরি হয়েছে। অনেক শ্রমিক তাদের একমাত্র সম্বল গরুগুলো চুরি হওয়ার কারণে নিঃস্ব হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এছাড়া মাধবপুর ইউপি চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু জানান, তার ইউনিয়নের রনজিৎ নুনিয়ার ২টি গরু, সুনীল শুক্ল বৈদ্যের ২টি, ইন্দ্রজিৎ নুনিয়ার ১টি, আব্দুল খালেকের ১টি, হারুন মিয়ার ১টি, বিমল সাঁওতালের ২টি, মনু মিয়ার ৪টি, জানকা নুনিয়ার ১টি গরুসহ পুরানবাড়ী, নোওয়াগাঁও, পদ্মছড়া, পাত্রখোলা, নুরজাহান, পতনঊষার, মাধবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গরু চুরি হয়েছে।

এই কয়েক মাসের ভেতরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক টাকার গরু চুরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও জানান, বেশীরভাগ গরু চুরি হয় বাগানের সেকশন এলাকা থেকে। সেকশন এলাকা নিরিবিলি থাকায় দিন দুপুরেই চোর দল প্রাইভেটকার, লাইটেস অথবা সিএনজিতে করে গরু তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় গরু নিতে না পারলে গরু পাহাড়ের ভেতরে জবাই করে বস্তার মধ্য করে মাংস নিয়ে যায়। মাঝে মধ্যে দুই-একজন চোর ধরা পড়লেও তাদের মদদদাতারা রয়ে যাচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন চা বাগান, গ্রাম এলাকা থেকে গরু চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটলেও কোন চোর ধরা না পড়ায় এবং চুরি যাওয়া গরুগুলো উদ্ধার না হওয়ায় কৃষকদের মাঝে হতাশা আর আতংক বিরাজ করছে। গত ৪ মাসে বেশ কয়েকটি গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোর কোন হদিস না পাওয়া ও সংঘবদ্ধ চোরের দল ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় কৃষকরা তাদের গরু নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। সেগুলো উদ্ধার কিংবা থানায় মামলা কোনটিই হয়নি।

কমলগঞ্জ থানার এএসআই আব্দুল হামিদ জানান, চা বাগান ও জাতীয় উদ্যানের একাংশে পাহাড়ি এলাকায় ঘোরে গরু ঘাস খায়। এ গরুগুলি ঘাস খেয়ে কিছুটা বিলম্বে চা বাগানে ফিরে। এ সুযোগে সন্ধ্যার পর স্থানীয় চোরচক্রের সাথে মিলে বহিরাগত গরু চোর চক্র সড়কধার থেকে গরু ধরে কারের পিছনের আসনে তুলে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। এমনি এক ঘটনায় বৃহস্পতিবার কমলগঞ্জ থানার শেষ সীমানায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ডলুবাড়ি এলাকায় প্রাইভেটকারসহ গরু চোর আটকের খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ গিয়ে তিন গরু চোরকে আটক করে। গরু উদ্ধার করে তিন চোরসহ প্রাইভেটকারটি প্রথমে শ্রীমঙ্গল থানা নিয়ে গেলেও পরে কমলগঞ্জ থানায় নিয়ে আসা হয়।

কমলগঞ্জ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাশ তিন গরু চোর আটক, দুটি গরু উদ্ধার ও চুরির কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার জব্দের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় আটক তিন গরু চোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় ও প্রাইভেটকারটি জব্দ দেখানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে জোর তদন্তক্রমে বাকি গরু চোরদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম