আইনী গ্যাড়াকলে বন্দী কোম্পানীগঞ্জের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সীমানা প্রাচীর

প্রকাশিত: ৯:৫১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২০

আইনী গ্যাড়াকলে বন্দী কোম্পানীগঞ্জের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সীমানা প্রাচীর

মো. মঈন উদ্দিন মিলন, কোম্পানীগঞ্জ থেকে
উত্তর সিলেটের প্রাচীন এক বিদ্যাপীঠের নাম ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৫৭ ইং সনে যার অগ্রযাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আব্বাস আলীসহ হাজী মোতালিব, হাজী মুজেফর আলীর ভূমিদানে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়। মোট ভূমির পরিমাণ ১ একর ৬০ শতক। জরাজীর্ণ টিনশেডের শ্রেণিকক্ষের মধ্য দিয়ে স্বল্প কিছু ছাত্র দিয়ে জুনিয়র স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা হোঁচট খেতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির, এমনকি স্বাধীনতার পূর্বে কিছুদিন প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ছাত্র অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় কয়েক বছর শিক্ষার প্রসার ব্যাহত হয়েছে।

বলাবাহুল্য স্কুলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অবকাঠামো উন্নয়ন ভূমিকায় আরেক নক্ষত্র ছিলেন মরহুম ছিফত উল্যাহ। তাঁর সুযোগ্যপুত্র সদ্যপ্রয়াত ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হক (হেডস্যার) আশির দশক থেকে স্কুলের হাল ধরে তিলে তিলে মেধা, শ্রম ও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন। কালেভদ্রে তা আজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও স্বনামধন্য এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমি সংক্রান্ত সীমানা নির্ধারণ জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে উন্নয়ন অগ্রগতি সীমানা প্রাচীর নির্মাণ। যা বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে সুখকর নয় বলে মন্তব্য এলাকার সুশীল সমাজের।

 

প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন ছাত্র ও পত্রিকার প্রতিবেদকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, বিগত প্রায় ১০বছর যাবৎ এই অচলাবস্থা বিরাজমান। প্রতিষ্ঠাতা হাজী আব্বাস আলীসহ অন্যান্য ভূমিদাতার মোট ১ একর ৬০ শতক ভ‚মি বর্তমান স্কুলের পশ্চিমে মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ (ফুরু হাজী)’র বাড়ির বিভিন্ন দাগে বর্ণিত ছিল। স্কুলটির আনুষাঙ্গিক সুবিধার্থে ১৯৮৬ ইং সনে বর্তমান স্থলাভিষিক্ত জায়গায় ১৩৬ শতক ভূমি অদল বদল হয়। বাকী ২৪ শতক ভূমি মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ বর্তমান স্কুল সংলগ্ন পূর্ব সীমানায় দানপত্র দলিল করে সমজিয়ে দেন। এতে ভূমিদাতার উত্তরাধিকারীগণ ভিন্নমত পোষণ করেন।

 

তাদের বক্তব্য হলো, তৎকালীন সময়ে স্কুলের সুবিধার্থে ১ একর ৬০ শতকের স্থলে ১ একর ৩৬ শতক সমজিয়ে নেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া পরবর্তীতে মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ এর দানপত্র দলিলমূলে ২৪ শতক ভূমির অংশ মূলত দানপত্রকারীর অংশে ৫ শতক। মূলত, এ কারণেই প্রথমে মৃধুযুদ্ধ, আইনী মারপ্যাঁচে ভূমিদাতার উত্তরাধিকার ও স্কুল পরিচালনা কমিটি (কর্তৃপক্ষ) বিগত বছর দশক ধরে দেনদরবার ও বারংবার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী আব্দুল বাছিরসহ গণ্যমান্যদের সালিসি বৈঠক/ স্কুলের দাপ্তরিকভাবে রেজ্যুলেশন তৈরিসহ বাস্তবায়নে একে অপরকে দোষারোপ করেন। অতঃপর সূরাহা না হওয়ায় বিশেষ আদালত পর্যন্ত দুটি মামলা চলমান রয়েছে। যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন অগ্রগতিতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারে দন্ডায়মান।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা কমিঠির সভাপতি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ আলী দুলালের সাথে প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা কমিঠির সভাপতি হিসেবে ২০১২ সাল নাগাদ দায়িত্ব পাওয়ার পর কলেজে রুপান্তর, সীমানা বাউন্ডারী নির্মাণ বিষয় ও পরীক্ষা কেন্দ্রস্হাপনসহ প্রাণপণ কাজ করেছি। যা এলাকার সর্বস্হরের জনগণ অবহিত। বিশেষ করে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে আমি বারংবার ভূমিদাতার উত্তরাধিকারী অ্যাডভোকেট বদরুল আলমসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করেছি, কিন্তু ন্যায়সংগত কোন সমাধানে রাজি হননি। বরং স্কুল কর্তৃপক্ষের উপর দুই দুইটি মামলা আদালতে দায়ের করেছেন। তাছাড়া আরও দুইটি মামলা আদালতে দায়ের করেছেন অ্যাডভোকেট বদরুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা।

 

তথ্যানুসারে বিগত ২০১৫ সালের সালিসি বৈঠকে বিরোধপূর্ণ ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ের আলোকে দাতা সদস্য অন্তর্ভুক্তকরণ রেজ্যুলেশন বাস্তবায়ন কেন হলো না এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সভাপতি মোহাম্মদ আলী দুলাল বলেন, দাতাসদস্য অন্তর্ভুক্তকরণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে ঠিক কিন্তু আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বলেছি চলমান মামলার দুপক্ষের উকিল মারফত সৃষ্ঠ জটিলতা আইনসিদ্ধ করে বিধিমোতাবেক দাতা সদস্য হতে আমার কোন আপত্তি নেই।

ভ‚মিদাতার উত্তরাধিকারী সংশ্লিষ্ঠ কর্মকান্ডে জড়িত অ্যাডভোকেট বদরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভূমিসংক্রান্ত ও সীমানায় বাউন্ডারি নির্মাণ প্রসঙ্গে স্হানীয়দের সাথে আলাপ করলে বিস্তারিত ঘটনা জানা যাবে। কারণ আমিতো এলাকায় থাকি না প্রতিবেদক আবারও স্টারম্যান উল্লেখ করে এ বিষয়ে কিছুটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করার অনুরোধ করলে তিনি সরাসরি টেবিল বৈঠকে বসলে বিস্তারিত বলবেন বলে আমন্ত্রণ জানান।

 

স্হানীয় ইউ/পি সদস্য আনিসুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ ভাটরাই উচ্চ বিদ্যলয় ও কলেজের ভূমিসংক্রান্ত ও সীমানার বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কয়েকবার সালিশ বৈঠকে বসা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ ভূমির মালিক আমার চাচা মরহুম হাজী আবদুল আজিজের উত্তরাধিকারী, বাবা সাবেক মেম্বার হাজী আব্দুল মছব্বিরসহ গংরা বিরোধপূর্ণ ভূমির স্হায়ী সমাধানে যেকোন সময় রাজী। তবে বিগত দিনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আপোষ নিষ্পত্তির আলোকে ২০১৫ সালের রেজ্যুলেশনের বাস্তবায়নের প্রতি ঈঙ্গিত দেন।

তৎকালীন সালিসি বৈঠকের প্রধান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী আব্দুল বাছির সাহেবের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টা অনেক পুরানা যা আদালতে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়িয়েছে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি স্কুলটির স্বার্থে দুইপক্ষকে বুঝিয়েছি সমাধানও করেছিলাম কিন্তু কে কার কথা শুনে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, মোহাম্মদ আলী দুলাল ও অ্যাডভোকেট বদরুল আলম এলাকার জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি হয়েও ওরা বুঝল না! তারপরও বিষয়টি সমাধান হউক এটাই কামনা।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম (ঠান্ডা স্যার)’র সাথে প্রতিবেদক সরাসরি সাক্ষাত করে বর্তমান হালচাল জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠে প্রায় ১১৪৪ জন ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মচারীসহ ৩২ জনের তদারকিতে প্রতিষ্টানটি তার স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ের আলোকে তিনি বলেন এই জটিলতার জন্য পরীক্ষার সেন্টার বহাল রাখতে আমাদের অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্র স্হাপনের ক্ষেত্রে সরকারী বিধিমালায় বাউন্ডারী থাকা অবশ্যম্ভাবীর উপর গুরুত্বারোপ করে সৃষ্টভূমিসংক্রান্ত জটিলতা অবিলম্বে সূরাহা হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন। সম্প্রতি বাউন্ডারি নির্মাণের জন্য সীমানা নির্ধারণের জন্য সরকারি সার্ভেয়ার আসার পর ভূমিসংক্রান্ত মামলা আদালতে চলমান থাকায় সীমানা চিহ্নিতকরণ ভেস্তে যায়। এ বিষয়ে তিনি অ্যাডভোকেট বদরুল আলমের সাথে বারংবার চেষ্টাও করেছেন বলে জানান।

 

ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এস,এস,সি( ৯৪ ব্যাচ) শামসুল ইসলাম ও শাকির উদ্দিন উপজেলার ইতিহাসে প্রথম তখনকার সময়ের স্টার মার্ক পেয়ে উপজেলাব্যাপী ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। যা একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যময় ও বর্তমান প্রজন্মের প্রেরণা যোগাতে সহায়ক। বর্তমানে শামসুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব হিসেবে কর্মরত আর শাকির উদ্দিন সালুটিকর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।

সবিশেষ প্রসংঙ্গক্রমে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে এ মেধাবী ছাত্র অধ্যক্ষ শাকির উদ্দিন বলেন, স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণœ রাখতে যেহেতু সামাজিক প্রতিষ্ঠান সেহেতু স্হানীয় প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সালিশ ব্যক্তিবর্গের সম্ন্বয়ে গঠিত উভয়পক্ষের আন্তরিকতায় ভূমিসংক্রান্ত আইনানুগ বিষয়াদী ফলো করে অবিলম্বে শিক্ষার আলো ত্বরান্বিত করবেন বলে মতামত ব্যক্ত করেন।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম