কোম্পানীগঞ্জের পাথর কোয়ারি পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রেরিত তিন সদস্যের টিম

প্রকাশিত: ৮:৪২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২০

কোম্পানীগঞ্জের পাথর কোয়ারি পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রেরিত তিন সদস্যের টিম

মো. মঈন উদ্দিন মিলন, কোম্পানীগঞ্জ থেকে
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরের একটি হোটেলের হলরুমে বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট জীবিকা নির্বাহকারী ব্যবসায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাথে সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এক আলোচনা সভার পর বিষয়টি নজরে এসেছে সরকার প্রধানের। তিনি সিলেটের অর্থনৈতিক অবস্থা অচল ও স্তবিরতা নিরসনে পাথর কোয়ারি খোলার ব্যাপারে সরজমিন তদন্ত রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শনিবার (২৯ আগস্ট) মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংষ্কার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী পরিদর্শন করেছেন।

 

শনিবার সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটের সময় সচিব কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম ভোলাগঞ্জ স্থল বন্দরে এসে পৌঁছেন। প্রতিকূল পরিবেশে ও প্রচন্ড বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমজীবি মানুষের উপস্থিতিতে মন্ত্রী পরিষদ সমন্বয় ও সংস্কার বিভাগের সচিব কামাল হোসেন পাথর কোয়ারীর বিভিন্ন সমস্যাদি খুটিয়ে খুটিয়ে অবলোকন করেন।

 

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন আচার্য, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপমা দাশ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল বাছির, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি নজরুল জাহান কাজল, ওসি (তদন্ত) মুজিবুর রহমান চৌধুরী, বৃহত্তর সিলেট পাথর ব্যাবসায়ী ঐক্য পরিষদের আহবায়ক ডা. আব্দুর নুর, আওয়ামীলীগ নেতা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, শ্রমিক ইউনিয়ন কোম্পানীগঞ্জ আঞ্চলিক শাখার সভাপতি সিরাজুল ইসলাম ইসলাম পুর পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ জামাল উদ্দিন প্রমুখ।

 

পরিদর্শন প্রসঙ্গে বৃহত্তর সিলেট পাথর ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্দুর নুর বলেন, পরিদর্শন টিমের সাথে কথা হয়েছে। সিলেটের পাথরের মানোন্নয়ন সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করেছি। দেশের অবকাঠামো নির্মাণে বৃহত্তর সিলেটের পাথরের ব্যবহার কী ভ‚মিকা রেখেছিল সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। তারা মনযোগ সহকারে সব কথা শুনেছেন। আমাদের সুখ-দুঃখের কথা প্রধানমন্ত্রীর নিকট তুলে ধরবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

 

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার উপজেলায় অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক দীর্ঘ ৫ বছর ধরে বেকার জীবনযাপন করছে। শ্রমিক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। শ্রমিকদের ভাগ্যনিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন শ্রমিক দুর্ভোগের কথা শুনেছেন, ইনশাল্লাহ এই অঞ্চলের কোয়ারীগুলো খোলা হবে। আমার শ্রমিক ভাইদের ঘরে আবারো সচ্ছলতা ফিরে আসবে।

 

উল্লেখ্য, দেশের বৃহত্তম পাথর কোয়ারি সিলেটের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি। খনিজ সম্পদে ভরপূর এই পাথর সম্রাজ্য থেকে পাথর আহরণ, ক্রয়-বিক্রয় করে কোম্পানীগঞ্জ তথা দেশের বিভিন্ন জেলার কয়েক লক্ষ শ্রমিকের রুটি রুজির ব্যবস্থা হতো। এমনটি চলে আসছে কয়েকযুগ ধরে। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই পাথর কোয়ারির উপর ভরসা করেই চলেছে শ্রমিকদের জীবন। তাছাড়া ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি হতে সরকারি কোষাগারে জমা হতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় আজ সেই পাথর কোয়ারি বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগে রয়েছেন পাথর উত্তোলন ও বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার মানুষ।

 

জানা যায়, এই কোয়ারির পাথর উত্তোলনের ধারাবাহিকতায় কালের পরিক্রমায় দেশের বিভিন্ন জেলাসহ উপজেলায় বিনিয়োগী হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। নিজেকে জড়িয়েছেন পাথর ব্যবসায়। কাজ না জানা অনেকেই এই ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বেশ সাবলম্বীও হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে স্টোন ক্রাশার। যার ফলে আবাসনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে বেগ পোহাতে হয়নি মালিকদের। বিদ্যুৎ গতিতে বাড়তে থাকে আবাসন। সেই সাথে দেশের প্রধান শহর ও শহরতলীতে গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক ভবন। নির্মিত হয় শিক্ষা ভবনও। পূরণ হতে থাকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে ভোলাগঞ্জের পাথর। এমনটি মনে করেন উপজেলার সচেতন মহল।

স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন আগেই কোয়ারিতে বহিরাগত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের আনাগোনায় বাজারঘাটসহ সবধরনের ব্যবসায় ছিল জমজমাট অবস্থা। একসময় যদিও সনাতন পদ্ধতিতে কোয়ারি সচল ছিল, পরে কিছু অসাধু চক্রের কারণে সেটি আবার অচল হয়ে পড়ে। ওই চক্র বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। পরিবেশ বাঁচাতে তৎপর হয় পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা। তারা বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে আইনীভাবে লড়তে আদালতে মামলা দায়ের করে। মূলত, ওই মামলার প্রেক্ষিতেই হাইকোর্ট সিলেটের সবকটি কোয়ারিতে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। ফলশ্রæতিতে কর্মহীন হয়ে পড়ে কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আগত শ্রমিকরা। এমনকি, কোয়ারি এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাবু গেড়ে থাকা শ্রমিকদের। নিরূপায় হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে প্রিয় কর্মস্থল ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় পাড়ি জমান তারা।

 

এদিকে, কর্মহীন শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন সিলেট ৪ আসনের সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ। তিনি শ্রমিকদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি সচল রাখার নির্দেশ দেন। গত শুকনো মৌসুমে সনাতন পদ্ধতিতে যথারীতি কোয়ারি সচল ছিল। কিন্তুকোয়ারির পার ধ্বসে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় ফের কোম্পানীগঞ্জ প্রশাসন ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন সরকার যে রাজস্ব পেতো তাও বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে আজ প্রায় দীর্ঘ ৭/৮ মাস যাবৎ শ্রমিক ব্যবসায়ী সবাই বেকারত্ব জীবন পার করছেন। এমন পরিস্থতিতে কোম্পানীগঞ্জের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ অর্থাভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে অনেকটা মানবেতর দিনযাপন করছেন।

 

সিলেটের পাথর উত্তোলনসহ ব্যবসা বাণিজ্য স্তবির হওয়ায় গোটা সিলেটে কয়েক লক্ষাধিক ব্যবসায়ী ও শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ২৩ আগস্ট (রবিবার) সকাল ১১টায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পাথর ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে সংগঠনের কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরের একটি হোটেলের হলরুমে বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট জীবিকা নির্বাহকারী ব্যবসায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাথে সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পাথর কোয়ারী খুলে দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে সুপারিশ করবেন মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আজ তিন সদস্য বিশিষ্ট পরিদর্শন টিম কোম্পানীগঞ্জে পৌছে এবং পাথর কোয়ারীগুলো সরজমিন পরিদর্শন করেন।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম