খামারের পরিচালক থেকে যেভাবে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার

প্রকাশিত: ৮:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২০

খামারের পরিচালক থেকে যেভাবে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার

ফাইল ছবি


সোনালী সিলেট ডেস্ক
আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোকে অনেকেই ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। গত ২৬ বছর ধরে শক্ত হাতে বেলারুশের ক্ষমতা ধরে রেখেছেন তিনি। কিন্তু গত নির্বাচনের পর থেকেই তিনি গণ-বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। বিতর্কিত নির্বাচনী ফলাফলের পর থেকে তার ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে।

 

লুকাশেঙ্কো ১৯৯৪ সালে দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। একমাত্র ওই একটি নির্বাচনই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিবেচনায় অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল।

 

এরপর লুকাশেঙ্কো পুনর্নিবাচিত হয়েছেন আরও পাঁচবার। এর মধ্যে চলতি বছরের ৯ আগস্ট ছিল দেশটির সর্বশেষ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে তিনি ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন।

 

এরপরই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বেলারুশ। নজিরবিহীন প্রতিবাদে অংশ নিতে রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তার ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি অনেকের কাছেই যেন এক রহস্য।

 

লুকাশেঙ্কোর ক্ষমতার উত্থান শুরু ১৯৯০ সালে। সে সময় বেলারুসের সংসদে নির্বাচিত হন তিনি। সংসদে দুর্নীতি দমন কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে তার ভূমিকা ছিল খুবই উদ্দীপনাময়। খুবই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন তিনি। পূর্ব বেলারুশের এক দরিদ্র গ্রামে একা তার মা তাকে বড় করেছেন।

 

১৯৭৫ সালে স্নাতক পাশ করেন লুকাশেঙ্কো। এরপর তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন এবং এরপর দু’বছর রাজনীতির প্রশিক্ষক হিসেবে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা প্রদান করেন। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তিনি।

 

১৯৮৫ সালে একটি সমবায় খামারের চেয়ারম্যান হন। এর ফলশ্রুতিতে তাকে ১৯৮৭ সালে দেশের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলীয় মাহিলিও এলাকায় একটি রাষ্ট্রীয় খামারের পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

 

দেশটির ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য জনগণের প্রার্থী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যানডার্স আসলান্ড নামের এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, তখন তার প্রচারণার মূল ফোকাস ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান। এছাড়া তার আর কোন লক্ষ্য বা সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল না।

 

কিন্তু ক্ষমতায় বসার পরই তার কমিউনিস্ট প্রতিপক্ষ যেসব নীতির ভিত্তিতে লড়ে ভোটে হেরেছিলেন, তার বেশিরভাগই লুকাশেঙ্কো নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেন। তার প্রতিপক্ষ ওই নির্বাচনে পেয়েছিলেন ১৪ শতাংশ ভোট আর মি. লুকাশেঙ্কো পান ৮০ শতাংশ ভোট।

 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যেসব আকস্মিক ও নাটকীয় নীতিমালা নেয়া হয়েছিল তিনি তার বিরোধিতা করেন এবং মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানার ভিত্তিতেই দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করেন। দেশটির সংবাদ মাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপরও তিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুরোপুরি বজায় রেখেছেন।

 

লুকাশেঙ্কোর শাসন পদ্ধতি সোভিয়েত জামানার স্বৈরাচারী ক্ষমতার মতো বলেই বর্ণনা করা হয়। তিনি দেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হয়রানি করার ও প্রয়োজনে জেলে পাঠানোর নীতি অনুসরণ করেছেন এবং নিরপেক্ষদের কণ্ঠরোধ করে তাদের একঘরে করে রেখেছেন।

 

তিনি ২০০৩ সালে বলেছিলেন, ‘আমার বৈশিষ্ট্য হল স্বৈরাচারী স্টাইলের শাসন। আমি সবসময়ই সেটা স্বীকার করেছি। দেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। মূল কথা হলো জনগণের জীবনকে ধ্বংস না করা।’

 

শক্তিশালী গোয়েন্দা পুলিশ এখনও সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কড়া নজর রাখে। এদের বেশিরভাগই হয় জেলে নাহয় নির্বাসনে। দেশটিতে প্রেসিডেন্টকে অপমান করা, এমনকি মজা করা হলেও তার শাস্তি কারাবাস।

 

বেলারুশ ইউরোপের এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একমাত্র দেশ যেখানে এখনও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াও গোপনীয়তায় ঢাকা।

 

মাথায় গুলি করে কত মানুষের মৃত্যুদণ্ড যে কার্যকর হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় ১৯৯৯ সালের পর থেকে ৩শ’য়ের বেশি মানুষকে এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

 

পশ্চিমা দেশগুলো থেকে পরিবর্তনের জন্য চাপ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট তার নীতিতে অনড় থেকেছেন। দেশটি ২০১১ সালে চড়া মুদ্রাস্ফীতির সংকটে পড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর পূর্বাভাস ছিল ২০২০ সালে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দার হার হবে ৬ শতাংশ। কিন্তু দেশটিতে বেকারত্ব প্রায় নেই বললেই চলে এবং বেলারুশের রফতানির গুরুত্বপূর্ণ বাজার এখনও রাশিয়া।

 

গত মে মাসের শেষ দিকে করোনা মহামারির কারণে বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ লকডাউন জারি রেখেছে। সে সময় লুকাশেঙ্কো বলেছেন, বেলারুশের অবস্থা অনেক ভালো এবং দেশটিতে লকডাউন না দেবার জন্য তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।

 

কোন কোন বিশ্লেষক বলছেন, লুকাশেঙ্কোর ওপর পদত্যাগের জন্য নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে।অনেকে আবার বলছেন, আগের নির্বাচনগুলোর পরেও তার ওপর চাপ এসেছিল কিন্তু তিনি টিকে ছিলেন।

 

এমনকি জর্জিয়া এবং প্রতিবেশি ইউক্রেনে শনাতনপন্থী শাসকদের যেভাবে পতন ঘটানে হয়েছে লুকাশেঙ্কো তার দেশে সে ধরনের বিপ্লবের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম