নগরের ফুটপাত বাণিজ্যে নেপথ্যের নায়ক এসআই আকবর ও এএসআই মোস্তফা

প্রকাশিত: ৯:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২০

নগরের ফুটপাত বাণিজ্যে নেপথ্যের নায়ক এসআই আকবর ও এএসআই মোস্তফা

রুবেল আহমদ
সিলেট মহানগরের ফুটপাত এখন হকারদের দখলে। নগরে যানজট হোক আর জনজট হোক, তাতে কিছুই যায় আসে না তাদের। পথচারীদের জন্য রয়েছে পিচঢালা রোড। ফুটপাত দিয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই নগরবাসীর। জীবিকার তাগিদে কর্মস্থলে পৌছতে হবে পিচঢালা রোড মাড়িয়ে। এতে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় যানজটের। ঘটে থাকে বিভিন্ন দুর্ঘটনাও। ফুটপাত থেকে সরে বসতে বললে হকারের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হতে হয় পথচারীদের। ফলস্বরূপ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয় হকারদের হাতে। নগরে এমন ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্য ব্যাপার। কোনো কিছুরই পরোয়া করে না হকাররা। তাদের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য শক্তি। যার ফলে ফুটপাত এখন তাদের বাপ-দাদার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে গেছে। সেই অদৃশ্য শক্তিকে শনাক্ত করতে অনুসন্ধানে নামে সোনালী সিলেট। দৃশ্যত হয় খুঁটির জোর। দৈনিক ও সাপ্তাহিক হারে মাসোয়ারা নিয়ে যারা হকারদের ফুটপাতের ভিটের মালিক বানিয়েছেন, এক এক করে সবার নাম সামনে চলে আসে।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, হকারদের পেছনে বড় শক্তি হয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন অভিযোগে বিতর্কিত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুইয়া ও এএসআই মোস্তফা। তাদের নেতৃত্বে নগরের সবকয়টি রাস্তায় ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয় হকারদের। ফুটপাত বাণিজ্যের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সিলেটের ক্বিনব্রিজ। ভারী যানচলাচল বন্ধ থাকাতে বেশ সুবিধাই হয়েছে তাদের। এখানে প্রতিদিন অন্ততঃ দেড়/দুইশ’ হকার বসানো যায়। আকবর ও মোস্তফার হয়ে কাজ করেন এমন ডজনখানেক যুবক রয়েছেন। যাদের কাজ হচ্ছে হকারদের ঠিক ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া। স্থায়ীভাবে ব্যবসা করা হকারদের মাসোয়ারা নিশ্চিত করা। নতুন কোনো হকার বসতে চাইলে তার সাথে আলোচনা করে মাসোয়ারা ঠিক করা। অস্থায়ী হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ১শ’-৩শ’ টাকা করে চাঁদা আদায় করা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুটপাতের পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন হোটেলেরও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন এসআই আকবর ও এএসআই মোস্তফা। তাদের প্রকাশ্য মদদে নগরের নাম সর্বস্ব হোটেলগুলোতে চলছে অবৈধ নারী ব্যবসা। এমনকি হোটেলের রোম ভাড়া নিয়ে সেখানে শিলং তীরের বোর্ড পরিচালনায়ও তাদের সহযোগিতা রয়েছে। প্রতিদিনই সন্ধ্যায় মহানগর পুলিশের ওই দুই অফিসারকে দেখা যায়, নগরের সুরমা মার্কেট ও বন্দরবাজারের লালবাজার এলাকার অলি-গলিতে। তবে, তারা সব থেকে বেশি সুবিধা ভোগ করছেন হকার বসানো ও উঠানোর কাজে।

 

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এমন অনেক ব্যবসায়ীরা বলেন, একদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী হকার উচ্ছেদে মরিয়া, অন্যদিকে আড়ালে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুইয়া ও এএসআই মোস্তফা হকারদের টাকার বিনিময়ে বসার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এতে ক্রেতারা মার্কেটে প্রবেশ না করে সস্তায় বাহির থেকেই কেনাকাটা করে ফিরে যাচ্ছেন। দিন দিন ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ছে মার্কেটগুলো। কাপড়ের বাজার বলেন আর সবজি বাজার বলেন সবখানেই এখন ক্রেতাশূন্য। সবাই এখন হকারদের দিকে ঝুকছেন। ফলে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। এছাড়া, ফুটপাতে হকারদের বসার কারণে পথচারীদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। প্রতিদিনই নগরে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কার্যক্রম।

 

নগরবাসী জানান, নগরের প্রায় ১০ কিলোমিটার ফুটপাত জুড়ে এখন নিত্যদিনই নানা নাটকীয়তা চলছে। সিলেট নগরের ফুটপাতে হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। নানা উদ্যোগেও সমস্যার সমাধান আসছে না। একে একে ব্যর্থ হচ্ছেন মেয়র। হার্ড লাইনে গিয়েও কিছু করতে পারছেন না তিনি। ভেঙে যাচ্ছে সব পরিকল্পনা। মেয়র প্রতিদিনই দখলমুক্ত করতে অ্যাকশন চালাচ্ছেন। কিন্তু কোনভাবেই ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। মেয়রের গাড়ি অথবা সিটি করপোরেশনের গাড়ী দেখলেই হকাররা দৌড়ে পালান, চলে গেলে ফের দখল করে বসেন। নগর ভবন কর্মকর্তা আর হকারদের মধ্যে প্রতিদিনই এমন চোর-পুলিশ খেলা চলছে।

 

সিলেট নগরের প্রধান এলাকাগুলো হলো- বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, কালিঘাট, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, তালতলা। এসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকার দুপাশে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালান হকাররা। নগরবাসীর সাথে একাত্মতা পোষন করে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে তৎপরতা চালায় নগর ভবন। ফুটপাতের দেওয়ালে ‘হকার বসা নিষেধ’ সম্বলিত নিষেধাজ্ঞা সাইনবোর্ড লাগানো হয়। তবে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হকাররা এখনও পর্যন্ত যেযার স্থানে বহাল তবিয়তে রয়েছে।

 

কার অনুমতি নিয়ে ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছো জানতে চাইলে হকাররা ক্ষোভের সাথে জানায়, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িকে আমরা জন প্রতি পঞ্চাশ থেকে তিনশত টাকা করে দেই, আবার দৌড়ানীও খাই। তারপরও যেভাবেই আছি, ভালই আছি। যতদিন বন্দর ফাঁড়ির আকবর ভাই আছেন, ততদিন আমরা এভাবেই চলবো।

 

দৌড়ানি খাওয়া প্রসঙ্গে হকাররা বলেন, পুলিশ আমাদের দৌড়ানি দেয় না। মাঝে মাঝে মেয়র আরিফের সাথে ম্যাজিস্ট্রেট থাকলে পুলিশও থাকে। সেক্ষেত্রে আমরা মালামাল নিয়ে পালিয়ে যাই। আবার চলে গেলে আমরা ফিরে আসি। উপর মহলের কোনো চাপ থাকলে আকবর ভাই আমাদের আগে থেকে জানিয়ে দেন। তখন আমাদের কৌশলী হতে হয়।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু লোকদের বাণিজ্যের কারণে হকাররা শক্ত শেকড়ে অবস্থান নিয়ে আছে সিলেটের ফুটপাতে। নগরজুড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ফুটপাতে মাসে প্রায় কোটি টাকার চাঁদা বাণিজ্য হচ্ছে। সিলেটের সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতা, পুলিশ এবং হকার নেতাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়রা হয় এই টাকা। যে কারণে হার্ড-লাইনে গিয়েও লাভ হয়নি। মেয়র ফুটপাত দখলমুক্ত করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন। যে কারণে দিন রাত কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিনই রাস্তায় নামছেন। লাঠি হাতে তাড়িয়ে দিচ্ছেন হকারদের। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ এই পুরনো সমস্যা থেকেই যাচ্ছে যার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারন জনগণ ও পথচারী। যে কারণে বিভিন্ন ধরনের ছোট খাটো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, নগরের হকার উচ্ছেদে নগর ভবন সর্বদা তৎপর রয়েছে। ফুটপাতকে দখলমুক্ত করতে নগর ভবন থেকে বার বার অভিযান চালানো হয়েছে। আমি নিজেও অনেকে অভিযানে অংশ নিয়ে হকারদের ধাওয়া করেছি। এরআগেও মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সহযোগিতায় নগর ভবন থেকে অভিযান চালানো হয়েছে। আপনারা দেখেছেন, রমজানের আগেও এই শহর অনেকটা হকারমুক্ত ছিলো। এখন হয়তো আবারও হকাররা ফুটপাতের দখল নিতে চেষ্টা করছে, তবে সেটা সম্ভব হবে না। নগর ভবনের হকার উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

ক্বিনব্রিজ সম্পর্কে মেয়র বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, কিছু অসাধু লোক ক্বিনব্রিজের দুই পাশের লোহার ব্যারিকেড ভেঙে দিয়েছে। যার ফলে সেখান দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা যাতায়াত করছে। নগর ভবনের পক্ষ থেকে ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞাজারী করে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। এটা রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব। এখন পুলিশ যদি সেগুলো না দেখে, তাহলে নগর ভবন কত খেয়াল রাখবে। পুলিশরা সব সময় টহলে রয়েছে, তারাতো দিনে রাতে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। কে বা কারা এগুলো চুরি করে নিয়ে যায় সেটাকি পুলিশ দেখে না?

 

মাসোয়ারার মাধ্যমে নগরে হকার বসানোর বিষয়টি অস্বীকার করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুইয়া জানান, ‘আমি কারো কাছ থেকে মাসোয়ারা নেইনি বা নগরের ফুটপাত দখলে কাউকে অনুমতি দেয়নি। আমার উপর আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। নগরের হকার উচ্ছেদে মেয়র বার বার অভিযান চালাচ্ছেন। সেই অভিযানে আমি নিজেও অংশ নিয়ে থাকি।’

 

তার নামে টাকা তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে হকারদের জানিয়ে রাখিÑ আমার নামে কেউ টাকা তুলতে গেলে তাকে বেঁধে রেখে আমাকে খবর দিবেন।’
এএসআই মোস্তফার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোস্তফার বিষয়ে এরকম অভিযোগ পেয়ে তাকে অন্যত্র বদলী করা হয়েছে।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম