নির্ধারিত সময়েও হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধ, আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা

প্রকাশিত: ৬:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০

নির্ধারিত সময়েও হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধ, আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা
নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুনামগঞ্জে ১১টি উপজেলার হাওরে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটি ।

 

শনিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারে এক সংবাদ সম্মেলনে হাওরের বাঁধের অগ্রগতি ও চলমান কাজের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরে সংগঠনের আগামীদিনের সাংগঠনিক ও আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 

প্রশাসনের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতায় ২০১৭ সালের মতো হাওরের পানি ঢুকে ফসলহানি হলে সংশ্লিষ্ট অফিস ঘেরাওসহ কর্মকর্তাদের আসামি করে আদালতে মামলা করারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

 

হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়।

 

লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওররক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংগঠনের সকল উপজেলা কমিটি থেকে পাওয়া তথ্য, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করা হয়নি বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

 

লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, শুরু থেকেই আশঙ্কা করা হয়েছিল এবারও সঠিক সময়ে কাজ শেষ হবে না। তাই প্রমাণিত হলো। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছি, মানববন্ধন করেছি। হাওর বাঁচাও’র দাবি ছিল প্রকাশ্যে সমাবেশের মাধ্যমে পিআইসি গঠন করার জন্য। কিন্ত এই দাবি মানা হয়নি। প্রশাসনের খেয়াল-খুশিমতো ইউএনও কার্যালয়ে বসে পিআইসি গঠন করা হয়েছে। এ কারণে সঠিক সময়ে কাজ শুরু হয়নি, শেষও হলো না।

 

লিখিত বক্তব্যে আরো উল্লেখ করা হয়, কয়েকদিন যাবত বিভিন্ন উপজেলায় পিআইসি সভাপতি/সদস্য সচিবকে আটক করে মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হচ্ছে। কাজের শেষ সময়ে এসে এসব কেন? এখন তো প্রশাসনের উচিত আনুষ্ঠানিকভাবে বাঁধের কাজ শেষ ঘোষণা করা। এগুলো কি সময় বাড়ানো এবং নিজেদের উপর থেকে দায় সরানোর পাঁয়তারা?

 

ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, উল্লেখ্য যথাযথ সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ার ফলে হাওরডুবি হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। পাউবো’র অগ্রগতি প্রতিবেদনেরও হাওরের কাজের সঙ্গে কোনো মিল নেই বলে জানানো হয়।

 

পাউবো সুত্রে জানা যায়, বাঁধে মাটি ভরাট কাজের ৫০-৫২ শতাংশ, দুরমুজ করা ৮-১০ শতাংশ, ঘাস লাগানো ৪-৫ শতাংশ, অন্যান্য ৩৩ শতাংশসহ মোট ১০০ শতাংশ কাজ হওয়ার কথা। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে বাঁধগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে তাতে কোথাও মাটির কাজ শেষ হয়েছে এমন বাঁধ আমরা দেখা যায়নি। যে বাঁধগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে তার মধ্যে দিরাই উপজেলার পিআইসি নং ৪, ৫, ৬, ৯, ১৩, ১৩ (ক), ১৪ (ক), ২৯ ও ৩৯ নং পিআইসির কাজের অবস্থা খুব নাজুক। এখানে বাঁধ তৈরির কোনো নীতিমালা মানা হয়নি।

 

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পিআইসি নং ১, ৩, ৪, ৬, ৯, ১৪, ১৫, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৪১, ৪২ ও ৪৩ এবং শাল্লা উপজেলার ১৪, ১৫, ২৩, ২৬, ৪৪, ৬৩, ৬৭, ৭১, ৭৪, ৭৬, ৮৯, ৯০, ১১১, ১১২, ১২৫, ১৩২, ১৩৭, ২৭, ৪১, ১১০, ১২৪, ১৩২ (ক), ৩৯, ৪০, ৪১, ৬৫,৭৪, ১০৭, ১২৩, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০, ১৩১, ১৩৩, ১৩৪, ১৩৮,১৩৯, ৮১,৮২ ও ৮৩ নং বাঁধের কাজের অবস্থাও খারাপ।

 

জগন্নাথপুর উপজেলার ২, ১১ ও ১২, জামালগঞ্জ উপজেলার ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩২, ৩৫, ৩৭, ৫১, ৫৬ ও ৬১, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পিআইসি নং ১, ২ ও ৬ এবং তাহিরপুর উপজেলার ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৫৯ ও ৬০ নং বাঁধগুলোতে কাজের মান খুবই খারাপ। বাঁধ নির্মানের নীতিমালা মানা হয়নি কাজের ক্ষেত্রে। এখন পর্যন্ত কাজও শেষ হয়নি বলে উল্লেখ করেন তারা।

 

সংবাদ সম্মেলনে আরো উল্লেখ করা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সংগঠনের বিভিন্ন উপজেলা কমিটির কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে এবং কৃষকদের সাথে কথা বলে হাওরে ৫০-৬০ ভাগ বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কোথাও কোথাও ৩০ ভাগ কাজও হয়নি বলে দাবি তাদের।

 

হাওরে অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে বলে জানান তারা। এবার হাওররক্ষা বাঁধে দিরাই-শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তারা।

 

তারা বলেন, কাজের শুরু থেকে পিআইসিকে চাপে রাখলে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগেই কাজ শেষ হয়ে যেত। হাওরে কোনো বিপর্যয় হলে এর দায় প্রশাসনকে নিতে হবে। সুনামগঞ্জের কৃষকদের নিয়ে প্রয়োজনে পাউবো অফিস, ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস ঘেরাও কর্মসূচিসহ আদালতে মামলা করে কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বলে ঘোষণা প্রদান করে হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটি।

 

এছাড়া নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ সমাপ্ত না করার প্রতিবাদে আগামী ২মার্চ থেকে জেলা সদর থেকে জেলার সকল উপজেলা সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পথসভা কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে ।

 

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, সহ-সভাপতি সুকেন্দু সেন, সিনিয়র সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসের পীর, ডা. মুরশেদ আলম, ইয়াবুব বখত বাহলুল, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সালেহীন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক এমরানুল হক চৌধুরী, এ কে কুদরত পাশা, সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার দাস, সহ-সভাপতি চন্দন কুমার রায়, সাধারণ সম্পাদক শহীদনূর আহমেদ, মানব চৌধুরী, সাবেক কাউন্সিলর মতিলাল চন্দ, আনোয়ারুল হক ,দিরাই উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদব শামছুল ইসলাম সরদার প্রমুখ।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
0Shares
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম